পঞ্চাশোর্ধ্ব ৩ নারীর একজন হাড়ক্ষয় রোগে আক্রান্ত
মেডিভয়েস রিপোর্ট: পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রতি তিনজন নারীর একজন এবং প্রতি পাঁচজন পুরুষের একজন হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। এটি বয়স্ক পুরুষ ও নারীদের মাঝে বেশ সাধারণ একটি রোগ, তবে হাড়ের ক্ষয় কম বয়সেও দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব অস্টিওপোরোসিসে দিবস উপলক্ষে আজ শনিবার (২১ অক্টোবর) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মিলন হলে আয়োজিত বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এসব কথা জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল-এই বিষয়টি মাথায় রেখে আপনি যখন দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন পরিবর্তন আনার কথা ভাবেন, অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ করার জন্য হাড়কে সুস্থ রাখা সেই তালিকার শীর্ষে রাখা উচিত।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, অস্টিওপোরোসিসে এমন একটি রোগ যেখানে হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যায়, ফলে ছোটখাটো আঘাত বা পতন, এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে হাঁচি দেয়ার মতো সহজাত কাজ থেকেও হাড় ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। এটি ধীরে ধীরে কয়েক বছর ধরে বিস্তৃত হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পতন বা কোনো আঘাতের ফলে হাড় ভেঙে যায় এবং ব্যথা অনুভূত হলে রোগীরা চিকিৎসকের কাছে আসেন। অথচ প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে জটিলতার অনেক আগেই এই রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা সম্ভব।
অস্টিওপোরোসিসের কারণ তুলে ধরে অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এটি বয়স্ক পুরুষ ও নারীদের মাঝে বেশ সাধারণ একটি রোগ, কিন্তু হাড়ের ক্ষয় কম বয়স থেকেও শুরু হতে পারে। ৫০ বছর বয়সের পর থেকে নতুন হাড় গঠনের চেয়ে হাড়ের ক্ষয়ের মাত্রা বেড়ে যায়, ফলে হাড়ের ঘনত্ব কমে গিয়ে হাড় ক্ষয় ত্বরান্বিত হয়।
পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্তের হার বেশি উল্লেখ করে বক্তারা জানান, এর কারণ মহিলাদের হাড়ের গঠন এমনিতেই পুরুষদের চেয়ে কিছুটা দুর্বল। এ ছাড়াও মেনোপজ পর্যায়ে (মাসিক সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাওয়া) পৌঁছানোর পর ইস্ট্রোজেনের অভাবে দ্রুত হাড় ক্ষয় হতে থাকে।
অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রতি তিনজন নারীর এক জন এবং প্রতি পাঁচজন পুরুষের এক জন অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। বয়সের সাথে বর্ধনশীল হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি ছাড়াও আরো কিছু কারণ আছে, যেগুলোর জন্য অস্টিওপরোসিস ত্বরান্বিত হতে পারে। যেমন—নিত্যদিনের খাবারে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও প্রোটিন ইত্যাদি কম গ্রহণ করা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, মদ্যপান, শরীরে ইস্ট্রোজেন (নারীদের ক্ষেত্রে) এবং টেস্টোস্টেরনের (পুরুষদের ক্ষেত্রে) মাত্রা কমে যাওয়া ইত্যাদি।
অনুষ্ঠানে হাড় ক্ষয়ের লক্ষণ তুলে ধরে বক্তারা বলেন, হাড় ক্ষয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ থাকে না। হাড় বেশি দুর্বল হয়ে গেলে যেসব লক্ষণ দেখা যায়, সেগুলো হলো, পিঠে ব্যথা অনুভব করা, উচ্চতা কমে যাওয়া (৪ সে.মি. বা তার চেয়েও বেশি কমে যাওয়া), হাঁটার সময় কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা (পাশের দিকে বেঁকে যাওয়া বা সামনের দিকে ঝুঁকে যাওয়া), শ্বাসকষ্ট অনুভব করা (সামনের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার কারে ফুসফুসের সক্ষমতা কমে যাওয়া)।
এ সময় অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে বিভিন্ন কৌশল বাতলে দেন বক্তারা। তারা জানান, বেশ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে হাড় ক্ষয় প্রতিরোধ করা সম্ভব, যার মধ্যে অন্যতম হলো ক্যালসিয়াম গ্রহণ।
নারীদের ক্ষেত্রে ৫০ বছর বয়স হলে ১০০০ মিলিগ্রাম (মি.গ্রা.) এবং ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে হলে প্রতিদিন ১২০০ মি.গ্রা. ক্যালসিয়াম গ্রহণ। ৭০ বছর বয়সের কম হলে প্রতিদিন ১০০ এবং ৭০ বছর বয়সের উর্দ্ধে হলে প্রতিদিন ১২০০ মি.গ্রা. সিয়াম গ্রহণ করা উচিত।
ক্যালসিয়াম বিভিন্ন খাবারে পাওয়া যায়, যেমন—দুগ্ধজাত দ্রব্য (পনির, দুধ, দই), সবুজ শাকসবজি (ফুলকপি, বাঁধাকপি, কচুশাক, পুইশাক, ব্রকলি ইত্যাদি), নরম হাড়সমৃদ্ধ মাছ (ছোট মাছ, চিংড়ি, মলা, ছোট শুটকি ইত্যাদি), সামুদ্রিক মাছ (সারডিন, স্যামন ইত্যাদি)। ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার (সয়াফুড, সিরিয়াল, ফলের রস)।
ভিটামিন ডি
পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি থাকলে তা শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণ করতে সহায়তা করে। ৭০ বছর বয়সের কম হলে প্রতিদিন ৬০০ আই.ইউ. এবং ৭০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে হলে প্রতিদিন ৮০০ আই. ইউ. ভিটামিন ডি গ্রহণ করা উচিত। সূর্যের আলো ভিটামিন ডি’র প্রধান উৎস। কিন্তু বিভিন্ন কারণে ভিটামিন ডি শোষণে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়, যেমন—অতিরিক্ত বায়ু দূষণ, শহরের বাসে অতিমাত্রায় ধোঁয়া, ধূলাবালি, কুয়াশা মিশ্রিত থাকলে, অতিমাত্রায় নগরায়ণ এবং ক্ষেত্রবিশেষে শরীরের চামড়া কালো হলে ভিটামিন ডি শোষণে বাঁধাগ্রস্ত হয়। এজন্য শুধুমাত্র সূর্যের আলোর উপর নির্ভর করলে চলবে না। শুধু খাদ্য থেকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পাওয়া কঠিন, তাই অনেকেরই মাল্টিভিটামিন বা ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট নেয়ার প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া দুধ, যকৃত, চর্বিযুক্ত মাছ ও ডিমের কুসুম ইত্যাদি খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে হবে।
ম্যাগনেসিয়াম
শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের অভাব থাকলে হাড় ভাঙা ত্বরান্বিত হয়। কেননা ম্যাগনেসিয়াম শরীরে ভিটামিন ডি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই হাড়ের সুস্থতার জন্য প্রতিদিন ৩৪০ মি.গ্রা. ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণ করা উচিত। এজন্য কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, কলা, ব্রাউন রাইস, লেগুমস্, ওটস্ ইত্যাদি প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখা আবশ্যক ।
জীবনধারা পরিবর্তন
সভাপতির বক্তব্যে বিএসএমএমইউর ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আব্দুল খায়ের মোহাম্মদ সালেক বলেন, সুস্থ থাকার জন্য হাঁটার বিকল্প নেই। তাই সামান্য দূরত্বের গন্তব্যে সবাইকে হেঁটে যেতে হবে।
এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে বেশি কিছু ব্যায়ামের পরামর্শ দেওয়া, যেগুলো হাড়কে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি ক্ষয় প্রতিরোধ করবে। এগুলো দিনে ৩০-৪৫ মিনিট করে সপ্তাহে অন্তত চার দিন নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে। এই ব্যায়ামগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—কিছু এরোবিক এক্সারসাইজ (জোরে জোরে হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং), মাসল স্ট্রেচিং (Calf মাসল, Quadriceps মাসল, Hamstring মাসল), মাংসপেশীকে শক্তিশালী করার জন্য ব্যায়াম (পুশ আপ, পল আপ, ওয়েট লিফটিং, কিছু রেসিস্ট্যান্ট এক্সারসাইজ), ওয়েট বিয়ারিং ব্যায়াম (ব্রিস্ক ওয়াক, স্টেয়ার ক্লাইম্বিং, রানিং, স্কিপিং) ইত্যাদি। এ ছাড়া নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণে সুষম খাবার খেতে হবে। অতিরিক্ত চা/কফি, ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে।
পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি প্রতিরোধ
অস্টিওপোরোসিসকে নিরব ঘাতক আখ্যা দিয়ে তারা বলেন, এটি হাড়গুলো ভঙ্গুর করে তোলে, অথচ প্রাথমিক অবস্থায় ক্ষয়ের লক্ষণ বোঝা যায় না।
তারা বলেন, হাড়ের ঘনত্ব কমে হাড় দুর্বল হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এজন্য বয়স্ক মানুষ, বিশেষ করে ৫০ বছরের বেশি বয়সী সবারই পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি প্রতিরোধে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেন তারা। সেগুলো হলো—
ক. ঘরের মেঝে সবসময় পরিষ্কার, শুকনো ও বাঁধামুক্ত রাখা (ছোট খেলনা, ছোট টেবিল, ফ্লোরম্যাট, কার্পেট এগুলো না রাখা), যেন তারা চলাচলের সময় বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে মাটিতে পড়ে না যান ৷
খ. মেঝে শুষ্ক রাখা, কখনোই পানি জমতে না দেওয়া, পানি বা তরল অন্য কিছু মেঝেতে পড়লেও সাথে সাথে মুছে শুষ্ক ও পরিষ্কার রাখতে হবে।
গ. বাথরুম/গোসলখানা স্যাঁতস্যাঁতে না রেখে সবসময় শুকনো রাখা, নন-স্লিপারি ম্যাট ব্যবহার করা এবং বাথরুমে একটি grab bar বসানো।
ঘ. বাসায় রাতেও ডিম লাইট বা হাল্কা আলোর ব্যবস্থা রাখা, বিশেষ করে শোবার ঘরে, যেন অন্ধকারে কোন সমস্যা না হয়।
ঙ. সিঁড়ির পাশে Hand-rail স্থাপন করা, সঠিকভাবে এর ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা।
চ. সঠিকভাবে টাইট-ফিট/ ওয়েল ফিটেড জুতা পরিধান করা, যেন পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি না থাকে।
ছ. চিকিৎসকের পরামর্শে যাদের ঘুমের ওষুধ/Anti-Psychotic জাতীয় ওষুধ সেবন করতে হয়, তারা ঘুম ভাঙার পর সাবধানে কিছু সময় বিছানায় বসে থেকে তারপর দাঁড়াবেন।
জ. নিয়মিত (বছরে অন্তত একবার) চোখের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করা।
এমইউ/এসএস
-
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
তিন দিনব্যাপী দ্বাদশ জাতীয় বিজ্ঞান সম্মেলন অনুষ্ঠিত
বিএসপিএমআর’র লাইফ টাইম এচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত অধ্যাপক কামরুল
-
০২ জুন, ২০২৫
গণঅভ্যুত্থানে হামলা-ভাঙচুর-হত্যাচেষ্টা
চাকরি হারাচ্ছেন বিএমইউর চিকিৎসকসহ ৩৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী
-
১৬ মার্চ, ২০২৫
-
১১ মার্চ, ২০২৫